সৌরজগতে প্রাণের অস্তিত্বের সম্ভাব্য স্থান


আজ পৃথিবীর বাইরে প্রাণ থাকতে পারেকিনা সে বিষয় নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করব৷ এই পর্ব Exoplanet [ বহির্গ্রহ (ইংরেজি ভাষায়: Exoplanet বা Extrasolar planet) বলতে সৌরজগতের বাইরের যেকোন গ্রহকে বোঝায়।
বাংলায় এদেরকে বহিঃসৌরজাগতিক গ্রহ বা বহির্জাগতিক গ্রহ নামেও ডাকা হয়।] নিয়ে আলোচনা নেই। অথাৎ সৌর জগতের অন্য কোনো গ্রহ বা উপগ্রহেে প্রান থাকতে পারে কিনা সেই বিষয় নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে। কথা না বাড়িয়ে চলুন শুরু করা যাক।

" তবু এই পৃথিবীর সব আলো একদিন নিভে গেলে পরে
পৃথিবীর সব গল্প ফুরাবে যখন,
মানুষ রবে না আর, রবে শুধু মানুষের স্বপ্ন তখন।"
—জীবনান্দ দাশ

গ্রীক দার্শণিক ও বিজ্ঞানী এরিস্টেটল ( জন্ম- খৃস্টপূর্ব ৩৮৪; মৃত্যু খৃস্টপূর্ব ৩২২) বোধহয় প্রথমে এ পৃথিবীতে প্রাণীর উৎপত্তি সম্বন্ধে ধারণা দেন। এরিস্টেটলের ধারণা ছিল যে, পৃথিবীর বাইরে এ মহাবিশ্বের অন্য কোথাও প্রাণের অস্তিত্ব নেই।এরিস্টেটলের সময় থেকে দুই হাজার দুই শ’বছরেরও বেশী সময় পার হয়েছে। এ দীর্ঘ সময়েও পৃথিবীর বাইরের অন্য কোথাও যে প্রাণের অস্তিত্ব আছে, সে প্রমান মেলেনি।
তাই ব’লে মহাকাশ বিজ্ঞানীরা কিন্তু বসে নেই। এ বিশাল বিপুল মহাবিশ্বের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোথাও কোথাও যে প্রাণের অস্তিত্ব আছে সে সম্ভাবনায় আশান্বিত হয়ে বিজ্ঞানীরা গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। নিরন্তর,নিরলস গবেষণা ও মহাকাশ অভিযানে হাজার হাজার নতুন গ্রহ-নক্ষত্র এবং আনুসঙ্গিক গ্রহানুপুঞ্জ আবিষ্কৃত হয়েছে। এ সৌরমন্ডলের বাইরের এক্সট্রা-টেরেশিয়াল জগতের সন্ধানেও ছুটছে মহাকাশযান। প্রতিদিন মহাবিশ্বের অজানা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ এবং তা পরীক্ষা-নিরিক্ষা ক’রে মহাকাশ বিজ্ঞানের দিগন্ত প্রসারিত হচ্ছে প্রায় অসীমেই।
তবুও এ পৃথিবীর বাইরে প্রাণের অস্তিত্ব সন্ধানের চেষ্টা এখনও সফলতার মুখ দেখেনি। কিন্তু মহাকাশ বিজ্ঞানীরা প্রাণের অস্তিত্বের সম্ভাব্য জায়গাগুলোর একটি তালিকা ক’রে ফেলেছেন। দীর্ঘ এ তালিকা থেকে প্রাণের অস্তিত্ব আছে এ রকম সম্ভাব্য ৬টি স্থানও অনেক মহাকাশ বিজ্ঞানীরা প্রকাশ করেছেন। এ তালিকাটি প্রাণের অস্তিত্বের বিজ্ঞানভিত্তিক প্রমান এবং তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণলব্ধ ফলাফলের উপরে ভিত্তি করেই করা।
(১) এনসিলয়াডাস ( Enceladus) : সৌরমন্ডলের শনিগ্রহের একটি উপগ্রহ বা চাঁদ এটি। প্রায় ৫০০ কিলোমিটার ব্যাসের এ উপগ্রহটি পৃথিবী থেকে ১.২৭২ বিলিয়ন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। শনি গ্রহের মোট ৬২টি উপগ্রহ বা চাঁদ আছে। এনসিলয়াডাস আকারের দিক থেকে ষষ্ঠ। এটি শনির বৃহত্তম উপগ্রহ টাইটান-এর প্রায় দশ ভাগের এক ভাগ।
মহাকাশ বিজ্ঞানীরা এনসিলয়াডাস সম্বন্ধে খুঁটিনাটি জানতে পারেন ১৯৮০ সালের দিকে। তখন ভয়েজার-১ এবং ভয়েজার-২ এনসিলয়াডাস এর সন্নিকট থেকে বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ করে। ২০০৫ সালের নাসার “ক্যাসিনি” মহাকাশযান এনসিলয়াডাসের বায়ুমন্ডলের ছবি প্রেরণ করে। সেখানে দেখা যায় যে, এনসিলয়াডাসের দক্ষিণাংশে জুড়ে আছে জমাট বরফের আস্তর। বিজ্ঞানীদের অনুমান, এই জমাট বরফের ন্যায় আস্তরের নিচেই থাকা সম্ভব তরল জলের। আর সেটা শনি ও এনসিলয়াডাসের মহাকর্ষ শক্তির টানেই সেখানে অবস্থান করছে। আর জলের অস্তিত্ব নিশ্চিত হ’লে সেখানে প্রাণের অস্তিত্ব থাকাও অসম্ভব নয়।
ক্যালিফোর্নিয়ার “ সেটি ( SETI) ইন্সটিটিউট”-এর বিজ্ঞানী সিন্থিয়া ফিলিপ্সের ধারণা, “ একদিন হয়ত শনির এই উপগ্রহের জলীয় স্তর থেকে প্রাণের অস্তিত্ব মহাশূন্যে নিক্ষিপ্ত হবে, আমাদের শুধু অপেক্ষার প্রহর গোনা মাত্র”।
(২) টাইটান (Titan) : শনির উপগ্রহ “টাইটান” নিয়ে বলার আগে “শনি গ্রহ” নিয়ে কিছু বলা দরকার। পৃথিবী থেকে সূর্য যে দিকে শনির অবস্থান ঠিক তার বিপরীত দিকে। দূরত্বের দিক থেকেও সূর্য ও শনি গ্রহের দূরত্ব পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্বের প্রায় ৯ গুন অর্থ্যাৎ ১.৪ বিলিয়ন কিলোমিটার। তাই সহজেই অনুমান করা যায় সূর্যের আলো ও উত্তাপ শনিগ্রহে পৌঁছে অনেক কম। আর শনিগ্রহ সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করতে সময় লাগে পৃথিবীর প্রায় সাড়ে ২৯ বছরের মতো।
কিন্তু একটি সম্ভাবনাময় দিক হলো, শনিগ্রহ এবং তার উপগ্রহে পৃথিবী ও মংগলের মতো একটি সক্রিয় বায়ুমন্ডল আছে। এই সক্রিয় বায়ুমন্ডলই বিজ্ঞানীদের আশাভরসা জাগিয়েছে। হাইড্রোজেন, হিলিয়াম ও মিথেন গ্যাসে ভরা এই দূরের গ্রহ ও তার উপগ্রহ নিয়েও তাই মহাকাশ বিজ্ঞানীদের এতো উৎসাহ -উদ্দীপনা।
শনির উপগ্রহ “ টাইটান” আবিষ্কার করেন ডাস মহাকাশবিজ্ঞানী ক্রিস্টিয়ান হিউজেন্স মার্চ ২৫, ১৬৬৫ সালে। গ্যালিলিও ১৬১০ সালে জুপিটারের সর্ববৃহৎ উপগ্রহ আবিষ্কার করেন এবং তা থেকে উদ্বুদ্ধ হয়েই ক্রিস্টিয়ান ও তার ভাই কন্সটান্টিন হিউজেন্স টেলিস্কোপের উন্নতি ও মহাকাশ নিয়ে নানা গবেষণা আরম্ভ করেন। মহাকাশ বিজ্ঞানে এই দুই ভাইয়ের অবদান গুরুত্বপূর্ণ ও অনস্বীকার্য।
১৬৬৫ সালের পর থেকে মহাকাশ বিজ্ঞানীরা “টাইটান” নিয়ে নানা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেন। সম্প্রতি নাসার বিজ্ঞানীরা “টাইটান”-এ মানুষের বসতি স্থাপনের পক্ষে কিছু যুক্তি উপস্থাপন করেছেন।
“টাইটান”-এর বায়ুমন্ডল মংগল এবং পৃথিবীর উপগ্রহ চাঁদের বায়ুমন্ডল থেকেও অনেক পুরু। ফলে সূর্যের আলো এবং বায়ুচাপের যে প্রতিকূলতা মহাকাশ বিজ্ঞানীরা মংগল ও চাঁদে সহ্য করেন, “টাইটান”-এ সেটা অনেকটা সহনীয় মাত্রায় থাকবে এখানে।
“টাইটান”-এর আয়তন আমাদের পৃথিবীর চাঁদের আয়তনের প্রায় দেড়গুন। একমাত্র পৃথিবীর বাইরে “টাইটান”-এ আছে তরল সমুদ্র এবং লেক। যদিও এ লেকের তরল পদার্থ জল নয়, শুধুই মিথেন গ্যাস। তবুও এই মিথেন গ্যাসের লেক বা সমুদ্রে মানুষ মিথেন প্রতিরোধক পোশাক নিয়ে সাঁতার কাটতেও পারবে; এ টুকু সম্ভাবনাও কিন্তু মংগল ও চাঁদের পৃষ্ঠে নেই।
এখানে মধ্যাকর্ষণ টান পৃথিবীর মাত্র ১৪ শতাংশ কিন্তু এর পুরু বায়ুমন্ডলের জন্য মংগল ও চন্দ্র পৃষ্ঠের তুলনায় এখানে মহাকাশের পোষাক প’রে চলাফেরা করা অনেক সহজ হবে ব’লেই ধারণা।
সূর্য থেকে অধিক দূরত্বের জন্য এখানকার গড় তাপমাত্রা মাইনাস ১৮০ ডিগ্রী সেলসিয়াসের মতো। “টাইটান” একটি নির্দিষ্ট অক্ষকে কেন্দ্র করে শনি গ্রহকে আবর্তন করে এবং একবার আবর্তন করতে সময় লাগে ১৫দিন ২২ ঘন্টা কিন্ত এর অবস্থানের জন্য টাইটানের “দিন” সব সময় এই কক্ষ আবর্তনের ঠিক সমান থাকে।
পৃথিবী থেকে “টাইটান”- এ যেতে সময় লাগবে প্রায় ৭ বছরেরও অধিক সময়। এই দীর্ঘ সময়ের জন্য শনি ও তার উপগ্রহ “টাইটান” নিয়ে গবেষণা করাও বেশ সময় সাপেক্ষ।
তবুও বিজ্ঞানীদের ধারণা, মংগল ও চন্দ্রপৃষ্ঠে মানুষের বসতি নিশ্চিত করতে মহাকাশ বিজ্ঞানীদের এখন থেকে যে সময়টুকু লাগবে , “টাইটান” অভিযানে এখন যেসব প্রতিকূলতা আছে সেগুলো ততোদিনে সমাধান হয়ে যাবে।
-Read this article in English Possible Places of Existence In The Solar System