অনুপ্রেরণাগোডাউন

হার্ভার্ড হয়ে এমআইটিতে কুয়েট ছাত্র

, January 18, 2020 WAT
Last Updated 2020-01-18T15:13:14Z
Advertisement

বাংলাদেশের অনেক প্রতিভাবান, কর্মনিষ্ঠ মানুষ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেকে এবং নিজের দেশকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। নিজের ক্যারিয়ার গড়ার পাশাপাশি তারা দেশের তরুণ সমাজের জন্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। এমনই একজন মানুষের জীবনের গল্প নিয়ে আমাদের আজকের আয়োজন।
প্রতি বছর অনেক বাংলদেশি ইঞ্জিনিয়ার উচ্চশিক্ষার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যান কিন্তু হাতেগোনা কয়েকজন সৌভাগ্যবান হার্ভার্ডে পড়ার সুযোগ পান। আরো সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, বাংলাদেশি ইঞ্জিনিয়ারদের মধ্যে এই প্রথম একজন কুয়েটিয়ান হার্ভার্ড এলামনাই ও হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল এলামনাই হিসেবে নিজেকে চিহ্নিত করতে পেরেছেন।

শুধু তাই নয়, তিনি এমআইটি (ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি) থেকেও এক্সিকিউটিভ সার্টিফিকেট (EC) অর্জন করেছেন। বলছিলাম শাহিনুর আলম জনির কথা। তার জীবনের গল্প শুরুর পূর্বে জেনে নেয়া যাক কিছু তথ্য। কারা ছিলেন হার্ভার্ড অ্যালামনাই, কাদের লিস্টে প্রতিনিধিত্ব করছেন শাহিনুর আলম জনি। বিখ্যাত হার্ভার্ড অ্যালামনাই লিস্টে আছেন– মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি, জর্জ ডব্লিউ. বুশ, ফ্র্যাংকলিন রুজভেল্ট, বারাক ওবামা, ফেসবুক ফাউন্ডার মার্ক জুকারবার্গ, মিট রমনি, মিশেল ওবামা, স্টিভ বালমার, জিম কচ, মেগ হোয়াইটম্যান, জেমি ডিমন, জেফ্রি ইমেল্ট, লেন ব্লাভাটনিক, বিল অ্যাকম্যান। আসা যাক, শাহিনুর আলম জনির কথায়। বর্তমানে তিনি ‘এরিকসন'(Ericsson), আয়ারল্যান্ড এ ‘সিনিয়র সল্যুশন ম্যানেজার ও প্রোগ্রাম ডিরেক্টর হিসেবে কর্মরত এবং ‘ইয়ুথ কার্নিভাল’ নামক একটি সামাজিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা, যার ফেসবুক ফলোয়ার সংখ্যা ২৭ লাখ। ১৮ বছরে ৫৬টি দেশে ১১০+ মাল্টি মিলিয়নের নেতৃত্ব দেয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে শাহিনুর আলমের।

চাকরির পাশাপাশি বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে লেখাপড়া করেছেন জনি। কখনো বিজনেস, কখনো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি যেমন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, মেশিন লার্নিং, ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং, বিগ ডাটা, IOT, ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিক্স, 5G ইত্যাদি নিয়েও পড়াশোনা করেছেন জনি। একটি মজার বিষয় হলো তিনি দেশের বাইরে থাকলেও বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অসংখ্যা শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি বেশ জনপ্রিয়। সবাই তাকে ‘জনি ভাই’ বলেই চেনে।

শাহিনুর আলম জনি বগুড়া জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। বগুড়া জিলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং বগুড়া ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। এরপর ১৯৯৭ সালে তৎকালীন বিআইটি, খুলনা অর্থাৎ খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) এর তড়িৎ কৌশল বিভাগে (Electrical Electronics and Communication Engineering) ভর্তি হন। কুয়েট এ চান্স পাবার পর সবাই বলতেন – এই বিষয় পড়ে লাভ নেই, চাকরি পাবে না। আবার সিভিল না নিয়ে EECE নেবার পর পরিচিতি সব ইঞ্জিনিয়াররা বলেছিলেন– নিজের হাতে জীবন ধ্বংস করেছ, কোথাও ভালো চাকরি পাবে না। ৭ম সেমিস্টারে আন্ডারগ্র্যাড থিসিসে মোবাইল টেলিকমের লিস্টেড ২- ৩ টার মধ্যে একটি নেবার প্রবল ইচ্ছা থাকার পরও নিতে পারেননি।

অতঃপর পাওয়ার সিস্টেমের উপর থিসিস করেছেন। ২০০২ সালে স্নাতক সম্পন্ন করেন। এরপর থেকেই মোবাইল কোম্পানিগুলোতে চাকরির চেষ্টা শুরু করেন। শুরু দিকে তেমন ভালো সাড়া পাননি। অধিকাংশ কোম্পানি ইন্টারভিউয়ের জন্য ডাকতো না। আবার যেগুলোতে ডাক পেতেন সেগুলোতে লিখিত পরীক্ষা ভালো হলেও ইন্টারভিউ সঠিকভাবে আগাতো না। গ্র্যাজুয়েশন শেষে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার’ হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে ক্যারিয়ার শুরু করেন। কিন্তু চাকরির খোঁজ চলতে থাকে। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ (IEB) যাতায়াত থাকার কারণে তৎকালীন ইনস্টিটিউট লিডার ইঞ্জিনিয়ার রিজু, মঞ্জুর মোর্শেদ,বাবু ভাইরা বেশ মূল্যবান কিছু উপদেশ দেন। তখন IEB ট্রেনিং সেন্টারে অনেক IT ট্রেনিং হতো। তারা সেগুলো করার পরামর্শ দেন। দুয়েকটা ট্রেনিং করার সময় Cisco আর CCNA এর খোঁজ পেয়ে ট্রেনিং করে ফেলেন ও সার্টিফিকেশন নেন। এরপরও চাইনিজ টেলিকম ভেন্ডর ZTE কর্পোরেশন্স কোম্পানিতে সার্ভিস ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগদান করেন। এরপর হুয়াওয়ে বাংলাদেশে কিছুদিন চাকরি করেন এবং চীনে হুয়াওয়ে এর হেড কোয়ার্টারে ট্রেনিং ও OJT করেন। এরপর তিনি এরিকসন বাংলাদেশে যোগদান করেন এবং টেলিকম নেটওয়ার্ক ট্রান্সফরমেশন প্রজেক্টে কাজ করেন ও মালয়েশিয়ায়ও ট্রেনিং নেন। এরিকসন বাংলাদেশে কাজ করার সময় কিভাবে সিভি লিখতে হয় ইন্টারন্যাশনাল জবের জন্য, কিভাবে ইন্টারভিউয়ের মুখোমুখি হতে হয় এই বিষয়গুলোত জ্ঞান অর্জন করেন বিদেশি সহকর্মীদের কাছ থেকে। সঠিক চ্যানেলে সঠিক সিভি পাঠানোর পরপরই ইন্টারভিউতে ডাক পেয়ে যান। তারপর তার প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও সফল ইন্টারভিউয়ের কারণে দুবাই এরিকসন ও মিশর এরিকসনে চাকরি পান।

অনেক খোঁজ খবর নিয়ে এরিকসন দুবাইয়ে যোগদান করেন কনসালটেন্ট হিসেবে এবং টেলিকম নেটওয়ার্ক ট্রান্সফরমেশন উইথ IP নেটওয়ার্কিং ও 3G নিয়ে কাজ করেন। আইভোরি কোস্ট ও নাইজেরিয়ায় 3G নিয়ে কাজ করেন। চাকরির পাশাপাশি Cisco আর CCNP ও PMI এর PMP নিয়ে পড়াশুনা চালিয়ে যান। ২০১০ সালে নাইজেরিয়ায় অবস্থানরত অবস্থায় বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার কারণে চাকরি হারান।

উল্লেখ্য, আমরা জানি ২০০৯- ২০১০ সালে বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার ফলে পুরো বিশ্বজুড়ে চাকরি ক্ষেত্রে সংকটাবস্থা শুরু হয়। এরপর তিনি দেশে ফিরে আসেন। ২০১০ সালে ভারতের Airtel এর 3G প্রজেক্টের জন্য তিনি মনোনীত হলেও সেসময় দুর্ভাগ্য ক্রমে ভিসা পাননি। স্বাভাবিকভাবেই খুব খারাপ একটা সময় তিনি পার করছিলেন,কিন্তু ভেঙ্গে পড়েননি, থেমে থাকেননি।

অলসভাবে বসে থেকে সময় নষ্ট না করে নিজেকে সামনে এগিয়ে নেয়ার জন্য, আরো বিকশিত করার জন্য CCDP, CCIP এবং PMP সার্টিফাইড হন। তথ্যপ্রযুক্তি ভিত্তিক প্রচুর পড়াশোনা করতে থাকেন। পাশাপাশি বিভিন্ন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোতে আবেদন করতে থাকেন। এক পর্যায়ে ভাগ্যের দুয়ার খুলে যায়। ২০১১ সালে তিনি এরিকসন চায়নায় যোগদান করার সুযোগ পান এবং সবচেয়ে বড় বিষয় তিনিই প্রথম বাংলাদেশি যিনি এরিকসন চায়নায় কাজ করার সুযোগ পান। চীনে তিনি ২০১১ এবং ২০১৩ তে দুইবার ‘Best Employee’ হিসেবে আখ্যায়িত হন। কথায় আছে: ‘পরিশ্রম কখনো বৃথা যায় না’।

২০১৩ সালে নিজেকে আরো সামনের দিকে এগিয়ে নিতে তল্পিতল্পা গুটিয়ে তিনি ইউরোপে পাড়ি জমান এবং এরিকসন, আয়ারল্যান্ডে যোগদানের মাধ্যমে জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করেন। এরপর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রজেক্টে কাজ করেছেন। আমেরিকা, সুইডেন, জার্মানি, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, মধ্যপ্রাচ্য, সৌদি আরব, লেবানন, জর্ডান, কানাডা, তুরস্ক, ইংল্যান্ড, সাউথ আফ্রিকা, ভারত, গুয়েতেমালা, মেক্সিকো, সুইজারল্যান্ড, ইতালি, মাল্টা, সার্বিয়া, নেদারল্যান্ডস, অস্ট্রেলিয়া সহ অনেক দেশেও কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে জনির ঝুলিতে।
-সংগৃহীত