অনুপ্রেরণাইঞ্জিনিয়ারিং

বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হওয়াই তো শেষ নয়

, December 24, 2019 WAT
Last Updated 2019-12-24T14:08:02Z
Advertisement
উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা যেদিন শুরু, ঠিক তার আগের দিন জন্ডিস ধরা পড়ে মুহাম্মদ সাদাত হোসেনের। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ডাক্তার বলেই দিলেন, ‘এ বছর পরীক্ষাটা না দিলে হয় না?’

জন্ডিসে কাবু হয়েও সাদাত কিন্তু ঠিকই পরীক্ষা দিয়েছিলেন। নইলে এ বছর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ভর্তি পরীক্ষার ফলাফলে প্রথম অবস্থানে হয়তো সাদাতের বদলে অন্য কারও নাম থাকত! ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন ১২ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী। সবার মধ্যে প্রথম—নটর ডেম কলেজের প্রাক্তন ছাত্র সাদাত হোসেন। সাদাতের কথায় অবশ্য কলেজের প্রসঙ্গ ঘুরেফিরে এতবার এল, মনে হয় ‘প্রাক্তন’ শব্দটা তিনি মেনে নিতে চাইবেন না। কলেজ পেরিয়েছেন, বুয়েটের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিষয়ে ভর্তিও হয়ে গেছেন। মন বোধ হয় এখনো কলেজেই পড়ে আছে। খুব জোর দিয়ে বললেন, ‘মা-বাবার পর বুয়েটে চান্স পাওয়ার পেছনে আমার কলেজের অবদানই সবচেয়ে বেশি। নটর ডেমে সবাই ভালো ছাত্র। আবার বুয়েটে যাঁরা পরীক্ষা দেন, তাঁরাও সব ভালো ছাত্র। তাই ভালোদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার একটা চর্চা আমার আগেই হয়ে গিয়েছিল। বুয়েটে যাঁদের সঙ্গে পড়ব, সেখানেও আমার কলেজের অনেক বন্ধু আছে।’

বুয়েটে পড়ার ইচ্ছের জন্মও হয়েছিল ওই নটর ডেম প্রাঙ্গণেই। স্কুলে পড়ার সময় জীবনের লক্ষ্য নিয়ে সাদাত খুব একটা ভাবেননি। কেউ যখন জিজ্ঞেস করত, ‘বড় হয়ে কী হতে চাও?’ সাদাত যা ইচ্ছে একটা কিছু বলে দিতেন, মনে যখন যা আসে। কিন্তু কলেজে ভর্তি হওয়ার পর দেখলেন, আশপাশের সবার গণিত আর পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি বেশ আগ্রহ। ব্যাস, সাদাতও মনে মনে ঠিক করে ফেললেন, বুয়েটে পড়বেন, প্রকৌশলী হবেন। প্রকৌশলী হয়ে দেশের জন্য একটা কিছু করার আগ্রহের কথাও বললেন তিনি।

‘ছোটবেলা থেকে সাদাত অঙ্কে খুব ভালো। ফাইনাল পরীক্ষা কখনো ১০০-র কম পায়নি।’ মায়ের এ বক্তব্য অবশ্য সাদাত মানতে চাইলেন না। দুদিকে মাথা নেড়ে বললেন, ‘না না, কখনো কখনো দু-এক নম্বর কম পেয়েছি।’ ছেলে যে কতটা মেধাবী, সেটা খুব আগ্রহ নিয়েই বললেন মা, ‘বুয়েটের ফল ঘোষণা করা হয় একটু দেরিতে। তত দিনে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফলাফল প্রকাশ পেয়ে গেছে। সেখানে সাদাতের অবস্থান ছিল ৩৪তম। এ ছাড়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এইচ ইউনিটে প্রথম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক ইউনিটে ১১তম এবং ঘ ইউনিটে ৪২তম, ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির ভর্তি পরীক্ষায় আমার ছেলে ৫ম হয়েছিল।’ সাদাত সঙ্গে যোগ করলেন, ‘বুয়েটে চান্স পেয়ে যাওয়ার পর আমি আর কোথাও ভর্তি পরীক্ষা দিইনি।’

অসুস্থতার মধ্যে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কারণে মনোবলে কোনো ঘাটতি ছিল কি না, জানতে চাইলে সাদাতের জবাব, ‘আমার বিশ্বাস ছিল, পরীক্ষায় যদি অ্যাটেন্ড করতে পারি, তাহলে খারাপ করব না। তা ছাড়া এইচএসসির রেজাল্ট নিয়ে আমি ভাবিনি। আমার মাথায় ছিল—বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার মতো যোগ্যতাটুকু অর্জন করতে পারলেই হলো।’

সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে সাদাত পার করেছেন তাঁর মাধ্যমিক। সে সময় থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি যুক্ত ছিলেন বিতর্কচর্চার সঙ্গে। অংশ নিয়েছেন বাংলাদেশ টেলিভিশনের বিতর্ক প্রতিযোগিতায়। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ আয়োজিত একটি রচনা প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছিলেন। কেমিস্ট্রি অলিম্পিয়াডে অংশ নিতে গিয়ে প্রথমবার বুয়েট ক্যাম্পাসে পা রেখেছিলেন। তখনো জানতেন না, একদিন এই ক্যাম্পাসের সঙ্গে তাঁর একটা নিবিড় সম্পর্ক হয়ে যাবে। সাদাত মনে করেন, পড়ালেখার পাশাপাশি কোনো একটা সহশিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে অবশ্যই যুক্ত থাকা উচিত।

সবশেষে একটা সরল প্রশ্নই করে বসি সাদাত হোসেনের কাছে। ‘বুয়েটে প্রথম হতে কেমন লাগে?’ স্বল্পভাষী তরুণ হেসে বলেন, ‘আমার চারপাশে সবার আনন্দ দেখে ভালো লাগছে। কিন্তু সত্যি কথা বলতে, এই প্রথম হওয়া না–হওয়ায় তো কিছু যায় আসে না। কেউ হয়তো প্রথম না হয়ে ১০০তম হয়েছে, সে-ও আমার সঙ্গে বুয়েটের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশলেই পড়বে। কেউ হয়তো বুয়েটে চান্স পায়নি, কিংবা পরীক্ষাই দেয়নি। তাতে কী যায় আসে? এটাই তো জীবনের শেষ নয়।’

সাদাতের ৫ পরামর্শঃ-

বিগত বছরগুলোতে বিভিন্ন সময় বুয়েটে যাঁরা প্রথম হয়েছেন, তাঁদের নিয়ে প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে স্বপ্ন নিয়েতে। সাদাত বললেন, স্কুল-কলেজে পড়ার সময় আগ্রহ নিয়েই সেসব লেখা তিনি পড়েছেন। বড়দের পরামর্শগুলো তাঁর ভালো লেগেছে। কিন্তু সোজাসাপ্টাভাবে এ-ও বললেন, ‘পরামর্শ শুনতে ভালো লাগে, অনুপ্রেরণা দেয়। কিন্তু বাস্তবে আসলে খুব একটা কাজে লাগে না। একেকজনের স্টাইল একেক রকম। নিজের চেষ্টাতেই শেষ পর্যন্ত ভালো ফল পাওয়া যায়।’
তবু, এখন যারা স্কুলে পড়ছে কিংবা সামনে বুয়েটে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন দেখছে, তাদের জন্য পাঁচটি পরামর্শ দিয়েছেন তিনি—


  •  সব বিষয়কেই সমান গুরুত্ব দিয়ে পড়তে হবে।



  •  বইয়ের কোনো অধ্যায় বা বিষয় বাদ দেওয়া যাবে না। প্রয়োজনে ইন্টারনেট বা অন্য কোনো সূত্র দেখতে হবে।



  •  উচ্চমাধ্যমিকের যেসব গাণিতিক সমস্যা রয়েছে, সেগুলো কম সময়ে কম জায়গার মধ্যে সমাধান করার অভ্যাস করতে হবে।



  •  প্রশ্ন কঠিন হলে সেটি সবার জন্যই কঠিন। এতে ঘাবড়ানো যাবে না। নিজের ওপর ভরসা রাখতে হবে।



  •  ভর্তি পরীক্ষায় চান্স পেতেই হবে—এ চিন্তা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। ভর্তি পরীক্ষা অন্য সব পরীক্ষার মতোই স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে হবে।


-প্রথম আলো থেকে...