স্যার আইজ্যাক আসিমভ জন্মেছিলেন সোভিয়েত রাশিয়ার ছোট্ট গ্রাম পেত্রোভিচিতে। মাত্র ৩ বছর বয়সে বাবা-মার সাথে চলে এসেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে। তখন কেই-বা জানত এই ছেলে একদিন সর্বজয়ী লেখক হবে, হবে সায়েন্স ফিকশন ধারার লেখার জগতের মহান পথিকৃৎদের একজন; মানুষ তাকে মনে রাখবে দ্য গ্র্যান্ডমাস্টার অফ সায়েন্স ফিকশন হিসেবে। জর্জ লুকাস তার বই থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বানিয়ে ফেলবেন স্টার ওয়ার্স এর মতো ব্লকবাস্টার মুভি সিরিজ। ইন্টারস্টেলার এর মতো মাস্টারপিস মুভির স্ক্রিপ্ট রাইটার জোনাথন নোলান তাকে মানবেন গুরু হিসেবে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ পল ক্রুগম্যান অনুপ্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করবেন তার ফাউন্ডেশন সিরিজের কথা। আর আধুনিক রোবোটিকসের সাথে তার নাম চিরদিন উচ্চারিত হবে তারই বানানো বিশ্ববিখ্যাত থ্রি ল’ অফ রোবোটিকসের জন্য। তিনি অনুপ্রাণিত করেছেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তর– জাতি, বয়স আর পেশা নির্বিশেষে। তার প্রভাবে প্রভাবিত হয়েছেন তার পরের প্রায় সব সায়েন্স ফিকশন লেখক। আর তার কলমের ছোঁয়ায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে হাজার হাজার বছর পরের মানব সভ্যতা। তার লেখা পড়ে শিহরিত হয়েছেন অসংখ্য পাঠক, অনেকেই হয়তো দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে কয়েক হাজার বছর পরের মানুষ কেমন হবে তা নিয়ে খানিকটা ভাবনা চিন্তাও করে ফেলেছেন। আজ স্যার আইজ্যাক আসিমভ সম্পর্কে কিছু জানার চেষ্টা করব। তাহলে চলুন শুরু করা যাক।


" যারা ভাবে যে তারা সবার চেয়ে বেশি জানে,
তারা সত্যিকার জ্ঞানীদের কাছে বিরক্তিকর "
— স্যার আইজ্যাক আসিমভ


স্যার আইজ্যাক আসিমভ অক্টোবর, ১৯১৯ থেকে জানুয়ারি ২, ১৯২০ তারিখের মধ্যবর্তী কোন এক সময়ে জন্মগ্র্রহণ করেন। তার জন্মস্থান আরএসএফএসআর (রাশিয়ান সোভিয়েত ফেডারেটেড সোশালিস্ট রিপাবলিক)-এর স্মলেন্‌স্ক ওব্লাস্ট অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত পেত্রোভিচি রাজ্যে। বর্তমানে এই রাজ্যটি বেলারুশ প্রজাতন্ত্রের Mahilyow প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত। আসিমভের বাবা জুডাহ আসিমভ এবং মা আন্না রাচেল বের্মান আসিমভ। ইহুদি এই পরিবার তৎকালীন রাশিয়ার ক্ষুদ্র কারখানা মালিক শ্রেণীর অন্তর্গত ছিল। তার জন্ম তারিখ নিশ্চিত করে বলা যায়না গ্রেগরীয় এবং হিব্রু বর্ষপঞ্জির পার্থক্য এবং সুষ্ঠু রেকর্ড সংরক্ষণের অভাবে। আসিমভ নিজে তার জন্মদিন সবসময় জানুয়ারি ২ তারিখে পালন করতেন।তার তিন বছর বয়সে তাদের পরিবার রাশিয়া থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হিসেবে চলে যায় এবং নিউ ইয়র্ক সিটির ব্রুকলিনে বসতি স্থাপন করে। পরিবারের ভিতরে সবাই ইদিশ এবং ইংরেজি ভাষায় কথা বলত। এ কারণে আসিমভ কখনই রাশিয়ান ভাষা শিখেননি। তিনি ইদিশ এবং ইংরেজি উভয় ভাষাতেই সমান পারদর্শী ছিলেন এবং মাত্র ৫ বছর বয়সে অনেকটা নিজে নিজেই পড়তে শিখে যান। ব্রুকলিনে তার পরিবার একটি ক্যান্ডি স্টোরের মালিকানা লাভ করেছিল যেখানে পরিবারের সবাইকে কাজ করতে হত। সেখানেই আসিমভ প্রথম সস্তা এবং জনপ্রিয় সব পত্রপত্রিকার সাথে পরিচিত হন এবং সেগুলো পড়তে শুরু করেন। মাত্র ১১ বছর বয়সে নিজে থেকে গল্প লিখতে শুরু করেছিলেন এবং ১৯ বছর বয়সে সেগুলো বিজ্ঞান কল্পকাহিনী পত্রিকার কাছে বিক্রি করতে শুরু করেন। এস্টাউন্ডিং সাইন্স ফিকশন পত্রিকার সম্পাদক জন ডব্লিউ ক্যাম্‌পবেল তার জীবনে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেছিলেন এবং পরবর্তিতে তার বিশ্বস্ত বন্ধুও হয়ে যান।
আসিমভ নিউ ইয়র্ক সিটির সরকারি স্কুলগুলোতে প্রাথমিক অধ্যয়ন শুরু করেন যার মধ্যে ছিল ব্রুকলিনের বয়েজ হাই স্কুল। পরে যান কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে যেখান থেকে ১৯৩৯ সালে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। এখান থেকেই ১৯৪৮ সালে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। মাঝে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিন বছর ফিলাডেলফিয়া নেভি ইয়ার্ডের ন্যাভাল এয়ার এক্সপেরিমেন্টাল স্টেশনে সিভিলিয়ান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। যুদ্ধের পর তাকে মার্কিন সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়,কিন্তু মাত্র নয় মাস পরেই সেখান থেকে সম্মানজনক অবসর প্রদান করা হয়। টাইপিংয়ে বিশেষ দক্ষতার জন্য তিনি সেনাবাহিনীতে করপোরাল পদে উন্নীত হয়েছিলেন। অবশ্য, ১৯৪৬ সালে বিকিনি প্রবাল প্রাচীরে পারমাণবিক বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণের কাজে অংশ নেয়া থেকে নিজেকে সূক্ষ্ণভাবে সরিয়ে নিয়েছিলেন।
ডক্টরেট সম্পন্ন করার পর আসিমভ বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ মেডিসিনে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। অনেকদিন এখানেই কর্মরতছিলেন। ১৯৫৮ সাল থেকে তার শিক্ষকতার ঝোঁক কমে আসে এবং পূর্ণোদ্যমে লেখালেখি শুরু করেন। লেখালেখির মাধ্যমে শিক্ষকতার চেয়ে অনেক বেশি অর্থ পেতেন। শিক্ষকতার সময়েই তিনি সহযোগী অধ্যাপক পদ পান এবং ১৯৭৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয় তার লেখার প্রতি সম্মান দেখিয়ে তাকে জৈব রসায়নের পূর্ণ অধ্যাপক পদ প্রদান করে। ১৯৬৫ থেকে পরবর্তী সময়ে আসিমভের ব্যক্তিগত রচনা ও পত্রাদি মুগার মেমোরিয়াল লাইব্রেরির সংগ্রহশালায় রক্ষিত আছে। কিউরেটর হাওয়ার্ড গটলিয়েবের অণুরোধে তিনি এই গ্রন্থাগারে কিছু অনুদান দিয়েছিলেন। সেখানে তার রচনাগুলো মোট ৪৬৪টি বাক্স দখল করে আছে এবং তাকটির মোট দৈর্ঘ্য ৭১ মিটার।
আসিমভ ১৯৪২ সালের জুলাই ২৬ তারিখে গেরট্রুড বালগারম্যানকে (১৯১৭, কানাডা - ১৯৯০, বোস্টন) বিয়ে করেন। তাদের ঘরে ডেভিড (জ. ১৯৫১) ও রবিন জোয়ান (জ. ১৯৫৫) নামক দুই সন্তানের জন্ম হয়। ১৯৭০ সালে গেরট্রুড ও আসিমভ পৃথক হয়ে যান এবং ১৯৭৩ সালে তাদের বিবাহ-বিচ্ছেদ হয়ে যায়। পরবর্তী বছর আসিমভ জেনেট ও জেপসনকে বিয়ে করেন।
আসিমভের ক্লসট্রোফিলিয়া ছিল, অর্থাৎ ছোট আবদ্ধ স্থানে থাকতে ভালবাসতেন। তার আত্মজীবনী গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে উল্লেখ করেছেন, তিনি ছোটবেলায় এমন একটি ম্যাগাজিন স্ট্যান্ডের মালিক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন যা নিউ ইয়র্ক সিটি সাবওয়ে স্টেশনে অবস্থিত এবং যেখানে তিনি নিজেকে আবদ্ধ রেখে চলমান ট্রেনের শব্দ শুনতে পাবেন। আসিমভের উড্ডয়ন ভীতি ছিল। জীবনে মাত্র দুবার তিনি বিমানে চড়েছেন। একবার স্যাভাল এয়ার এক্সপেরিমেন্টাল স্টেশনে কাজ করার সময় এবং আরেকবার ১৯৪৬ সালে ওয়াহু সামরিক ঘাঁটি থেকে বাড়ি ফেরার সময়। জীবনে খুব কমই অনেক দূরত্ব অতিক্রম করেছেন। কারণ বিমান ছাড়া বিশাল দূরত্ব ভ্রমণ সুবিধাজনক ছিলনা, আর তিনি বিমানে চড়তে চাইতেন না। এই ভীতিটি তার বেশ কিছু কল্পকাহিনী রচনায় ছাপ ফেলেছে। যেমন, ওয়েন্ডেল উর্‌থ নামক রহস্য গল্পসমূহ এবং এলিজাহ বেলি সম্বন্ধীয় রোবট গল্পসমূহ। জীবনের শেষ বছরগুলোতে তিনি প্রমোদ জাহাজে করে ভ্রমণে বেশ মজা পেয়ে যান। পরবর্তীকালে এ ধরনের ভ্রমণে অনেক সময় ব্যয় করেছেন এবং জাহাজে চড়ে থাকা অবস্থায়ে বেশ কিছু বিজ্ঞান বক্তৃতা দিয়েছেন, যেমন আরএমএস কুইন এলিজাবেথ ২ জাহাজে চড়ে। তিনি অসাধারণ জনপ্রিয় বিনোদন ব্যক্তিত্ব এবং বক্তা ছিলেন। তার সময় জ্ঞান ছিল প্রখর, কখনও ঘড়ি দেখতেন না, কিন্তু সময় বলে দিতে পারতেন প্রায় নিখুঁত।
অধিকাংশ বিজ্ঞান কল্পকাহিনী সম্মেলনেই তিনি উপস্থিত থাকতেন, তার স্বভাব ছিল নমনীয়। হাজার হাজার প্রশ্নের জবাব দিতেন বিনা সংকোচে, কখনই বিরক্ত হতেন না। ভক্তদের কাছ থেকে পাওয়া পোস্টকার্ডের জবাব দিতেন আর অটোগ্রাফ দিতে কার্পণ্য করতেন না। তার উচ্চতা ছিল মাঝারি, শ্মশ্রু খানিকটা অদ্ভুত, গালের দুপাশেই কান থেকে দাড়ি রয়েছে তবে থুতনির গোড়ায়ে এসে থেমে গেছে। থুতনিতে কোন শ্মশ্রু ছিলনা। এই স্টাইলটিকে আমেরিকায় মাটনচপ বলা হয়। তার কথা বলার ভঙ্গী ছিল অনন্য ব্রুকলিন-ইদিশ ঢঙের। শারীরিক সক্ষমতা তার তেমন একটা ছিলনা, কখনও সাঁতার কাটতে সাইকেল চালাতে শিখেননি। অবশ্য বোস্টনে আসার পর গাড়ি চালানো শিখেছিলেন। তার রম্য রচনা আসিমভ লাফ্‌স এগেইন-এ লিখেছেন বোস্টনে গাড়ি চালানো মানে "চাকার উপর নির্যাতন করা"।
- নাজমুল  হাসান
পূর্ববর্তী আর্টিকেল পরবর্তী আর্টিকেল