জ্যোতির্বিজ্ঞানবিজ্ঞানীমনীষীমহাকাশ

জ্যোতির্বিদ চার্লস মেসিয়ারঃ-(১ম পর্ব)

, June 28, 2019 WAT
Last Updated 2019-10-26T21:25:33Z
Advertisement
১৭৩০ সালের ২৬ই জুন ফ্রান্সের ব্যাদনভিওঁতে চার্লস মেসিয়ার নামের এক জ্যোতির্বিদ জন্মগ্রহণ করেছিলেন।


গ্যালিলিওর টেলিস্কোপ দিয়ে প্রথম তারা দেখা ও নিউটনের প্রতিফলন টেলিস্কোপ আবিস্কারের মাধ্যমে আধুনিক পর্যবেক্ষণ জ্যোতির্বিদ্যার সুচনা ঘটে । তার পড় তাদের পথ ধরে আকাশের নেশায় মত্ত হয়ে গেল মানুষ । শুরুও হল, আকাশ দেখা । আর একসময় তো মানুষের মাঝে নেশাতে পরিণত হল । আমরা ছোটবেলায় দাদি-নানী বা ঠাকুরমাদের কাছে শুনেছি যে রাতের বেলায় আকাশে না তাকাতে । তারা সঠিক কারন না বললেও , এটুকু বলতএন যে রাতের বেলায় আকাশে জীন-ভূত ,অসুর, শয়তান, প্রেতাত্নারা ঘুরে বেরায় । প্রাচীনকালেও মানুষ কিন্তু এমন ভয়ে আকাশের দিকে তাকাতেন না । আর তখন তো আর আধুনিক যুগের মত রকমারি হরেক রঙয়ের আলো ছিল না । তাই স্বাভাবিক ভাবেই সূর্য ডোবার পরে মানুষের মধ্যেও একটু ভয় কাজ করত । কিন্তু এই ভয়কে সরাজ্ঞান করে কিছু মানুষ তাদের নিজের আপন মহিমায় মহিমান্বিত হয়ে ডাক দিলেন আধুনিক সভ্যতা সুচনার ।
আমরা জানি পৃথিবীর আবর্তন ও প্রদক্ষিন উভয় ঘটনার জন্য দৈনিক ও ঋতুচক্রহারে আকাশে জ্যোতিষ্কদের অবস্থান পরিবর্তন হয় । তাই আমরা আকাশে এখন যা দেখব , আগামি ১ মাস পরে একদম সম্পূর্ণ আলাদা রকম দেখব । কিন্তু আবার ১ বছর পর ঠিক এমনি দেখব । আবার আকাশে তারারা কিন্তু একটা নির্দিষ্ট ও সুশৃঙ্খল ভাবে অবস্থান করে । আর তাদের এই সুশৃঙ্খল অবস্থানও সময়ের চক্রে পরিবর্তিত হয় । আর তাদের এই সুশৃঙ্খল অবস্থানে প্রত্যেক তারা , নিহারিকার অবস্থান সুনির্দিষ্ট । এরা প্রত্যেকেই গতিশীল , সূর্যও সৌরজগত সমেত তাদের সাথে গতিশীল বিধায় তাদের অবস্থানের পার্থক্য আমরা বুঝতে পারি না ।

আকাশে শুধু টেলিস্কোপ দিয়ে একটা দিকে তাকালেই গ্রহ , নিহারিকা দেখা যাবে না । তারা যেহেতু একই সাথে সময়চক্রে অবস্থান পরিবর্তন করে ও গতিশীল তাই তাদের খুজে পাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট দিকে তাকাতে হবে । অনেক আগে থেকেই নক্ষত্রমণ্ডলের মাধ্যমে মানুষ খালি চোখে তারাদের অবস্থান আগেই লিপিবদ্ধ করেছে । কিন্তু টেলিস্কোপ আবিষ্কার হওয়ার পরে মানুষ খালি চোখের বাহিরেও হাজার হাজার তারা , তারা স্তবক, নিহারিকা দেখতে শুরু করল । কিন্তু অভিজ্ঞ জ্যোতির্বিদদের পক্ষেও তো আর তো সুধুমাত্র শুনেই সেগুলোকে খুজে পাওয়া কঠিন । এই ভাবনা থেকে জ্যোতিষ্কদের একটি তালিকা প্রনয়ন করেন চার্লস মেসিয়ার । যা মেসিয়ার তালিকা বলে । আমরা বিভিন্ন জ্যোতিষ্ক আলোচনা করতে গিয়ে নামের আগে মেসিয়ার কথা দেখি । চার্লস মেসিয়ার যে যে জ্যোতিষ্ক আবিষ্কার করেছেন তাদেরকে তার সম্মানার্থে নামকরন করা হয়েছে । মেসিয়ার তালিকায় স্থানপ্রাপ্ত জ্যোতিষ্কদের মেসিয়ার অবজেক্ট বলে ।জ্যোতিষ্কদের খোঁজার বিড়ম্বনা থেকে সময় বাঁচাতে গিয়ে তাঁর বন্ধু ও সহকারী পিয়েরে মেকেইকে সাথে নিয়ে এগুলোর তালিকা করে ফেললেন। বর্তমানে এই তালিকায় ৩৯টি গ্যালাক্সি, ৭ টি নেবুলা বা নীহারিকা, ৫টি গ্রহ নীহারিকা এবং ৫৫টি তারা স্তবক (Star Cluster) আছে।এই তালিকায় প্রাথমিক দিকে জ্যোতিষ্কদের অবস্থান , আপাত উজ্জ্বলতা উল্লেখিত থাকত । তবে সময়ের পরিবর্তনেও আধুনিক যুগেও সেই তালিকা ,আনা হলেও এখন অনেক কিছু বিস্তারিত থাকে । এই তালিকা অনেকটা টেলিস্কোপের ইউজার ম্যানুয়ালের মত । তাই টেলিস্কোপের এই বিস্তারিত আলোচনায় এটি না তুলে ধরে পারলাম না ।


১৭৭৪ সালে প্রথম প্রকাশিত এই তালিকায় ৪৫ টি বস্তুর নাম ছিল। এতে যে শুধু তাঁর আবিষ্কৃত বস্তুই ছিল তা নয়, তার আগের জ্যোতির্বিদদের পর্যবেক্ষণকৃত বস্তুও এতে ছিল। প্রকৃতপক্ষে প্রথম প্রকাশিত ৪৫ টি বস্তুর মধ্যে তাঁর নিজের আবিষ্কৃত ছিল মাত্র ১৭টি। ১৭৮০ সাল নাগাদ তালিকাতে বস্তুর সংখ্যা দাঁড়ায় ৮০। তালিকার চূড়ান্ত সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৭৮১ সালে। এতে ১০৩ টি বস্তুর তালিকা ছিল। ১৯২১ থেকে ১৯৬৬ সালে এই তালিকায় আরো ৭টি বস্তুকে যুক্ত করলেন। এই বস্তুগুলো মেসিয়ে বা মেকেই চূড়ান্ত সংস্করণ প্রকাশ করার পরে পর্যবেক্ষণ করেন বলে নিজেরা যুক্ত করে যেতে পারেননি।বর্তমানে পেশাদার ও শখের জ্যোতির্বিদরা সমানে এই বস্তুগুলোর নাম ব্যবহার করেন। এই বস্তুগুলোর তুলনামূলক উজ্জ্বলতার কারণে এরা শখের জ্যোতির্বিদদের কাছেও খুব জনপ্রিয় বস্তু। চার্লস মেসিয়ার তার আবিষ্কৃত সব জ্যোতিষ্ককে এই তালিকায় লিপিবদ্ধ করেন । শুধু তাই না , তারা পিছনে দৌড়ানোর সময় তার বন্ধু পিঁয়েরে মেকেই এরও বেশ কয়েকটি আবিষ্কার করা জ্যোতিষ্ক এই তালিকায় রয়েছে । বর্তমানে এই তালিকায় ১১০ টি বস্তু আছে। তাঁর নামানুসারেই বস্তুগুলোকে বলা হয় মেসিয়ার অবজেক্ট। যেমন অ্যান্ড্রোমিডা গ্যলাক্সিকে বলা হয় মেসিয়ার ৩১ বা সংক্ষেপে এম ৩১। ফরাসী জ্যোতির্বিদ শার্লে মেসিয়ে(Charles Messier বা চার্লস মেসিয়ার) ছিলেন মূলত ধূমকেতু শিকারী। অনেকগুলো বস্তুকে তিনি এক সময় ধূমকেতু মনে করে তালিকাভূক্ত করলেও পরে জানা যায় এরা ধূমকেতু নয়। তিনি হতাশ হলেন। পরে মুলত এদের পেছনে সময় নষ্ট করা থেকে বাঁচতে এদের একটি তালিকা করলেন। তাঁর হতাশা থেকে উৎপন্ন সেই তালিকার জন্যেই বর্তমানে তিনি বিখ্যাত।
-নাজমুল হাসান