পদার্থবিজ্ঞানবিজ্ঞানীবিষয়ভিত্তিকরসায়নবিজ্ঞান

ইলেক্ট্রন আবিষ্কার ও থমসন

, May 01, 2019 WAT
Last Updated 2020-07-27T00:49:17Z
Advertisement
স্যার জে জে থমসন
 গ্রিকদের সময় থেকেই দার্শনিকদের ধারণা ছিলো সকল পদার্থ, পরমানু (Atom) নামক অতিক্ষুদ্র, অবিভাজ্য কণা দ্বারা গঠিত। অর্থাৎ যেকোনো পদার্থকে ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে সর্বশেষ যে অবস্থা পাওয়া সম্ভব তাই পরমানু। কিন্তু বর্তমানে আমাদের ভাঙ্গার দৌড় পরমানু পর্যন্ত আটকে থেকে নেই। পরমানুকে ভেঙ্গে আমরা এর ভেতর থেকে বের করে এনেছি ইলেকট্রন, নিউক্লি (Nuclei)। তবে পরমাণুকে যে বিভাজ্য করা সম্ভব অর্থাৎ, পরমানুও আরো ক্ষুদ্র কণাদের দ্বারা তৈরি তা আমরা জেনেছি মাত্র ১২০ হল ! পরমানু গঠনের সর্বপ্রথম যে মৌলিক উপাদান আবিস্কার হয় তা হল ইলেকট্রন ! আমরা জানি ইলেকট্রন হল ঋণাত্মক আধানযুক্ত কণিকা , যা মহাবিশ্ব সমস্ত সাধারন পদার্থে উপস্থিত !
ইলেকট্রন যে একটি মৌলিক কণিকা তা সর্বপ্রথম বিজ্ঞানী স্যার জোসেফ জন থমসন ১৮৯৭ সালে আজকের দিনে আবিষ্কার করেন। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাভেন্ডিস গবেষণাগারে ক্যাথোড রশ্মি নল নিয়ে গবেষণা করার সময় তিনি এই আবিষ্কার করেন। ক্যাথোড রশ্মি নল হল একটি সম্পূর্ণ বদ্ধ কাচের সিলিন্ডার যার মধ্যে দুইটি তড়িৎদ্বার (electrode) শুন্য স্থান দ্বারা পৃথক করা থাকে এবং অল্প পরিমান নিম্ন চাপে গ্যাস থাকে। যখন দুইটি তড়িৎ ধারকের মধ্যে বিভব পার্থক্য প্রয়োগ করা হয় তখন ঋণাত্মক তড়িৎদ্বার বা ক্যাথোডের নিকটের গ্যাস গুলো আভার মত জ্বলতে থাকে । ক্যাথোড থেকে এক ধরনের
নির্গত রশ্মি(কণার নির্গমনের) জন্য নলের মধ্যে এই আভার সৃষ্টি হয় ! এই রশ্মিকে ক্যাথোড রশ্মি বলে । এই রশ্মির প্রকৃতি সম্পর্কে জানতে উপর্যুপরী পরীক্ষার মাধ্যমে থমসন প্রমাণ করেন যে চৌম্বকত্বের সাহায্যে রশ্মি থেকে ঋণাত্মক আধান পৃথক করা যায় না; তবে তড়িৎ ক্ষেত্র দ্বারা রশ্মিগুলোকে বিক্ষিপ্ত করা যায়। মূলত ইলেকট্রনের আবিষ্কার এবং এর অংশসমূহ সম্বন্ধে ধারণা লাভ করতে গিয়ে টমসনকে তিন তিনটি পরীক্ষা সম্পাদন করতে হয়েছিলো:
প্রথমত:
এই পরীক্ষার সাথে ১৮৯৫ সালে জ্যাঁ পেরিন কৃত পরীক্ষার বেশ মিল ছিল। টমসন এক জোড়া ধাতুর সিলিন্ডার দ্বারা একটি ক্যাথোড রশ্মি নল তৈরি করেন যার মধ্যে একটি সংকীর্ণ ফাঁক ছিল। এই সিলিন্ডারদ্বয় আবার একটি ইলেকট্রোমিটারের সাথে সংযুক্ত ছিল যাতে তড়িৎ আধান সংরক্ষণ এবং পরিমাপ করা যায়। পেরিন দেখেছিলেন ক্যাথোড রশ্মি একটি তড়িৎ আধান জমা করে। টমসন দেখতে চেয়েছিলেন একটি চুম্বকের মাধ্যমে রশ্মিগুলো বাঁকিয়ে রশ্মি থেকে আধান পৃথক করা যায় কি-না। তিনি দেখতে পান রশ্মিগুলো যখন সিলিন্ডারের সরু ফাঁকে প্রবেশ করে তখন ইলেকট্রোমিটারে ঋণাত্মক আধানের আধিক্য দেখা যায়। রশ্মিগুলো বাঁকিয়ে দিলে মিটারে ঋণাত্মক আধানের পরিমাণ এতো হয়না, কারণ রশ্মি তখন ফাঁকে প্রবেশেরই সুযোগ পায় না। এ থেকে স্পষ্টতই ধারণা করে নেয়া যায় যে ক্যাথোড রশ্মি এবং ঋণাত্মক আধান যেভাবেই হোক একসাথে থাকে, এদের পৃথক করা যায় না। 
দ্বিতীয়ত:
পদার্থবিজ্ঞানীরা তড়িৎ ক্ষেত্রের সাহায্যে ক্যাথোড রশ্মি বাঁকানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। এবার টমসন একটি নতুন পরীক্ষণের কথা চিন্তা করেন। একটি আয়নিত কণা তড়িৎ ক্ষেত্র দ্বারা প্রভাবিত হলে অবশ্যই বেঁকে যাবে, কিন্তু যদি একে যদি একটি পরিবাহী দ্বারা ঘিরে দেয়া হয় তবে আর বাঁকবে না। তিনি সন্দেহ করেন যে নলের মধ্যে বিরাজমান গ্যাস বিশেষ পরিস্থিতিতে ক্যাথোড রশ্মির কারণেই তড়িৎ পরিবাহীতে পরিণত হয়েছে। এই ধারণা প্রমাণ করার জন্য অনেক কষ্টে তিনি একটি নলকে প্রায় বিশুদ্ধ শূণ্যস্থান করতে সমর্থ হন। এবার পরীক্ষা চালিয়ে দেখা যায় ক্যাথোড রশ্মি তড়িৎ ক্ষেত্র দ্বারা বেঁকে যাচ্ছে। এই দুইটি পরীক্ষণ থেকে থমসন সিদ্ধান্তে পৌঁছান,
"আমি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছা থেকে কোন ভাবেই পালাতে পারিনা যে ক্যাথোড রশ্মি হল ঋণাত্মক তড়িৎের আধান যা পদার্থের কণিকা দ্বারা বাহিত হয়।.... এই কণিকাগুলো কি? এরা কি পরমাণু, অথবা অণু, অথবা এমন পদার্থ যা এখন পর্যন্ত উপবিভাগের একটি সূক্ষ্মতম পর্যায়ে রয়েছে?"
তৃতীয়ত:
থমসনের তৃতীয় পরীক্ষার বিষয়বস্তু ছিল কণিকাসমূহের মৌলিক বৈশিষ্ট্যসমূহ অনুসন্ধান করা। তিনি যদিও এ ধরনের কোন কণিকার সরাসরি ভর বা আধান বরে করতে পারেন নি, তবে চুম্বকত্বের দ্বারা এই রশ্মিগুলো কতটা বাঁকে এবং এদের মধ্যে কি পরিমাণ শক্তি রয়েছে তা পরিমাপ করতে পেরেছিলেন। এই উপাত্তগুলোর মাধ্যমে তিনি একটি কণিকার ভর(m) এবং এর তড়িৎ আধানের(e) মধ্যে একটি অণুপাত বের করেন। অর্থাৎ, e/m = 1.8 10-11 coulombs/kg.
নিশ্চয়তার জন্য তিনি অনেক ধরনের নল এবং গ্যাস নিয়ে পরীক্ষণ সম্পাদন করার মাধ্যমে উপাত্তগুলো সংগ্রহ করেন। এই অণুপাত থেকে বেশ আশ্চর্যজনক ফল পাওয়া যায়; এর মান একটি আয়নিত হাইড্রোজেনের তুলনায় আঠারশ গুণেরও বেশি ছোট হয় ! ইলেকট্রনের আবিস্কার সম্পর্কে মোটামুটি নিশ্চিত হলেন থমসন ! তব ইলেকট্রন আবিস্কারের বেশ আগে প্রথমে ক্যাথোড রের নির্গমনের বিষয়টির কিছুটা হুবহু "উত্তপ্ত তার থেকে রশ্মির নির্গমন" নামে এক ঘটনা ১৮৮৩ সালে আল্ভা এডিসন নিজের নামে পেটেন্ট করে নিয়েছিলেন যাকে এডিসন ইফেক্ট বলে !
elektron হল গ্রীক শব্দ যা হল এক চিরসবুজ গাছের জমাটবাধা দানাদার আঠা ! যা কোন কাপড়ে ঘষলে হাল্কা বস্তু যেমন চুল , ছোট টুকরোকৃত কাগজকে আকর্ষণ করে ! এই ইলেকট্রন থেকেই ইলেক্ট্রিসিটি , ইলেক্ট্রনিক্সের নামকরন ! ইলেকট্রন আবিস্কারের পরে থমসন পরমানুর গঠন সম্পর্কে প্লাম-পুডিং মডেল নামে এক মডেল দাড় করান । পুডিংয়ের ভিতরে কিশমিশ যেমন বিক্ষিপ্ত ভাবে ছড়িয়ে থাকে পরমাণুতে ঠিক তেমনি নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে বন্টিত ধনাত্মক আধানের মধ্যে ইলেকট্রন ছড়িয়ে আছে। দেশজভাবে এ মডেলকে তরমুজ মডেল বলা যেতে পারে। তরমুজের রসালো অংশকে যদি ধনাত্মক আধান বিবেচনা করা হয় এবং তরমুজের বিচিকে যদি ঋনাত্মক আধানযুক্ত ইলেকট্রন মনে করা হয় তাহলে তরমুজের রসালো অংশের মধ্যে এর বীচিগুলো বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে থাকাকে থমসন পরমাণু মডেলের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। একে থমসনের পরমানু মডেলও বলে !
আমরা জানি ষ্ট্যাণ্ডার্ড মডেল অনুযায়ী ইলেকট্রন হল লেপ্টন শ্রেণিভুক্ত কণা ! ইলেকট্রনও তরঙ্গের মত আচরন করে । অর্থাৎ কণা-তরঙ্গ দ্বৈততা! ইলেকট্রন আবিস্কারের জন্য ১৯০৬ সালে থমসন নোবেল পুরুস্কার লাভ করেন !