গোডাউনপরামর্শ

গ্রাজুয়েটদের উদ্দেশ্যে একজন প্রভাষকের খোলা চিঠি

, April 02, 2019 WAT
Last Updated 2019-10-26T21:25:38Z
Advertisement

বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকানোর পর ছোটখাটো একটা রেস্টুরেন্ট খুলেছিল আমার এক বন্ধু। আমন্ত্রণ রক্ষা করতে একদিন তার ওখানে গেলাম।
আড্ডা দিতে গিয়ে খেয়াল করলাম, যতবারই নতুন কাস্টোমার এসে বসে, আমার বন্ধু গিয়ে অভ্যর্থনা জানাচ্ছে। এমনকি খাবার সার্ভও করছে। জিজ্ঞেস করলে বন্ধু জানালো, দুজন কর্মচারী অনুপস্থিত থাকায় তাকেও নামতে হয়েছে। আমি সাহায্য করতে চাইলে সে বলল, "হেনরি, তোকে ভাড়া করার মতো সামর্থ্য আমার নেই। এখানকার অ্যাটেন্ডেন্টদের আমি ১০০০০ শিলিং করে দেই। তোর বেতন কোথা থেকে দেব?" বললাম, দেয়া লাগবে না।
চমকপ্রদ এক ঘটনা ঘটে তখন।
সার্ভ করার পাশাপাশি বন্ধুর সাথে মশকরা করছি, এমন সময় দুই তরুণ-তরুণী আসে, যাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুদিন ক্লাস নিয়েছিলাম। প্রথমে ওরা নিজেদের চোখ বিশ্বাস করতে না পারলেও বারবার আমাকে দেখছিল নিশ্চিত হওয়ার জন্য।
যখন আমি মাথা ঝুঁকিয়ে সম্ভাষণ জানিয়ে অর্ডার জানতে চাইলাম, বিস্মিত দুজন বলে উঠল, "আপনি এখানে কী করছেন, স্যার?" বললাম, ওদের সার্ভ করতে এসেছি। একে অপরের দিকে তাকাল ওরা, চেহারায় বিস্ময়। আমি কেন একটা রেস্টুরেন্টে কাজ করছি, ভেবে অবাক।
মেয়েটা বলে উঠল, "কিন্তু, স্যার, আপনি কেন এখানে কাজ করছেন? আপনি আমাদের সার্ভ করতে পারেন না। মানে...?" অবিশ্বাস নিয়ে মাথা দোলালো ও, "...আপনি কেন একটা রেস্টুররেন্টে কাজ করবেন?" বললাম, আমি খুশি মনেই ওদের সার্ভ করব। আশ্বস্ত করে বললাম অর্ডার দিতে। তবে ওদের সংকোচ দেখেই বুঝলাম, খুব একটা স্বস্তি দিতে পারিনি।
আমার উপস্থিতি আর কাজ নিয়ে বেশ অস্বস্তিতে ভুগলেও শেষমেশ অর্ডার দিল ওরা। আমি খাবার সাজিয়ে দিয়ে ফের বন্ধুর সাথে আড্ডায় মশগুল হলাম। মাঝেমাঝে অবশ্য গিয়ে ওই দুজনকে জিজ্ঞেস করলাম, আর কিছু লাগবে কিনা। ওদের খাওয়া শেষে আমার বন্ধু বিল প্রিন্ট করে দিলে আমি নিয়ে গেলাম।
বিল এসেছে ২৪৫০০ শিলিং। বিলের কাগজটা টেবিলে রেখে আমি প্লেট নিয়ে চলে গেলাম। ২০০০০ আর ১০০০০ শিলিং এর দুটো নোট টেবিলে রেখে চলে গেল ওরা। বন্ধুকে নোট দুটো দিলে সে ৫৫০০ শিলিং ফেরত দিল, যা আমি পকেটে পুরলাম। ও, বলতে ভুলে গেছি, এরিমধ্যে আমি বাকি ৮ কাস্টোমার থেকে ১৫০০০ শিলিং টিপস হিসেবে পেয়েছি। মোট হলো ২০৫০০ শিলিং।
ছাত্রছাত্রী দুজন বেরিয়ে যাবার মূহুর্তে আমি হাত তুলে বিদায় জানালাম। ওরা চলে গেল।
সেদিন যখন বাড়ি ফিরছিলাম, ওই দুজনের কথা মাথায় ঘুরছিল। ওরা যে বিস্মিত হয়েছিল, তাতে কোন দোষ নেই। তাদের ওই অবিশ্বাস আমাদের ঘুণেধরা সমাজের এক সমস্যারই বহি:প্রকাশ। ওই দুজন আরও হাজারো জনের প্রতিচ্ছবি।
অন্য দেশের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার আগ্রহ আর ভ্রমণের সুবাদে আমি অবাক হয়ে দেখেছি, উন্নত দেশগুলোয় কোন পেশাকে খাটো করে দেখা হয় না। একজন প্রভাষককে রেস্টুরেন্টের কর্মচারী হিসেবে কল্পনাই করতে পারছিল না আমার ছাত্রছাত্রীরা। যেহেতু তারা আমার যোগ্যতা ও পেশা সম্পর্কে জানে, এটা তাদের মাথায় ধরছিল না যে কিভাবে আমি একটা রেস্টুরেন্টে কাজ করতে পারি। যেন আমি যা করছিলাম, তা আমার উচ্চশিক্ষার জন্য মর্যাদাহানিকর।
যখন আমি ইংল্যান্ডে লিভারপুল স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিনে পড়তাম, আমারই এক সহপাঠী তার বিএমডব্লিউ পার্ক করে রেস্তোরায় ঢুকত ওয়েটার হিসেবে কাজ করতে। ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও তাকে উপার্জন করে তার থাকার জন্য ভাড়া পরিশোধ করতে হতো নিজের পিতাকে। প্রথমে আমিও অবাক হয়েছিলাম। উন্নত দেশগুলোয় এটা কিন্তু খুবই সাধারণ চিত্র।
যে শিক্ষাটা আমি ওদের থেকে নিয়েছি, তা হলো কাজ করতে পারাটা একটা গুণ। কাজ করতেই হবে। তা পিতামাতা ধনাঢ্য হলেও। হোয়াইট কালার কাজই হতে হবে এমন না। বসে বসে ভালো চাকুরীর আশায় দিন পার করা চলবে না। যদি পিতামাতা থেকে অর্থ ধার করো, তা ফেরত দিতে হবে। নিজের পায়ে দাঁড়ানোটাই মূল কথা। রেস্টুরেন্টে কাজ করলেই সার্টিফিকেটের দাম কমে না।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের কর্মমুখী হতে হবে। ছাত্রদের দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কেন লাইব্রেরি, রান্নাঘর, হোস্টেল পরিষ্কার করায় না, তা আমার বোধগম্য না। এত এত ছাত্র থাকতেও, যারা পরিশ্রম করতে সক্ষম, বাইরে থেকে কর্মী আনাটা সঠিক নয়। কাজকে নিচু চোখে দেখো না। শুধু কাজ করে যাও। নিজেকে ব্যস্ত রাখো। ধরে নাও, লজ্জার কিছু নেই, তাহলে কী করতে? যদি তোমার ডিগ্রী না থাকতো, তাহলে কী করতে? যদি কেউ চাকুরী পেতে সাহায্য না করে, তাহলে?
এমনকি যদি তুমি ভালো কোথাও চাকুরী পেয়েও যাও, হাতে সময় থাকলে পার্ট-টাইম কাজ করতে তো সমস্যা নেই। ডিগ্রী এখন অহরহ পাওয়া যায়। সেসব ভুলে নিজেকে কাজে লাগাও। কাজকে হেয় করো না।
-এডউউইন ব্যাটারিঙ্গায়া
(সংক্ষেপিত)
-সায়েদ সিহাব